হাইকোর্টে বহাল রাশেদা, প্রশ্নবিদ্ধ তৈয়ব-আফরোজার নিয়োগ সনদ জালিয়াতি ; শ্যামলীর বিদেশ অবস্থানে প্রশ্ন, মন্ত্রণালয়ের তদন্তে অর্থ আত্মসাতের প্রমাণ নেই

মৌলভীবাজারের হাফিজা খাতুন বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ে প্রশাসনিক বিরোধ, শিক্ষক নিয়োগ, শিক্ষাগত সনদ, কোচিং কার্যক্রম ও দায়িত্ব পালনের নানা অভিযোগ ঘিরে তৈরি হয়েছে প্রশ্নের পর প্রশ্ন। একদিকে প্রধান শিক্ষিকা রাশেদা বেগমের বিরুদ্ধে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগের তদন্ত হয়েছে; অন্যদিকে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়/প্রাতিষ্ঠানিক তদন্তে তাঁর বিরুদ্ধে অর্থ আত্মসাতের প্রমাণ মেলেনি বলে জানা গেছে। পরবর্তীতে হাইকোর্টের আদেশে তিনি প্রধান শিক্ষিকার পদে বহাল রয়েছেন।
অন্যদিকে কয়েকজন শিক্ষক-শিক্ষিকার নিয়োগ ও দায়িত্ব পালনের বিষয়ে ওঠা অভিযোগগুলো এখনো নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি রাখে।
রাশেদার বিরুদ্ধে অর্থ আত্মসাতের প্রমাণ নেই
প্রধান শিক্ষিকা রাশেদা বেগমকে ঘিরে বিদ্যালয়ের তহবিল, টিফিন ও অন্যান্য আর্থিক বিষয়ে অনিয়মের অভিযোগ সামনে আসে। বিষয়টি তদন্তের আওতায়ও যায়। তবে সংশ্লিষ্ট তদন্তে তাঁর বিরুদ্ধে অর্থ আত্মসাতের প্রমাণ পাওয়া যায়নি বলে জানা গেছে।
তাঁর বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ও তদন্তে অসহযোগিতার অভিযোগকে কেন্দ্র করে দায়িত্বে থাকার বিষয়ে যে জটিলতা তৈরি হয়েছিল, তা নিয়ে তিনি উচ্চ আদালতে যান। হাইকোর্টের আদেশে তিনি প্রধান শিক্ষিকার পদে বহাল রয়েছেন এবং রিট নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত তাঁর অবস্থান বহাল থাকার বিষয়টি সামনে এসেছে।
ফলে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগকে প্রমাণিত ঘটনা হিসেবে উপস্থাপনের সুযোগ নেই—তদন্তের ফলাফলই এখানে গুরুত্বপূর্ণ।
২০১২ সালের নিয়োগ, ২০১৮ সালের সনদ—তৈয়বকে ঘিরে প্রশ্ন
শিক্ষক মোঃ তৈয়ব আলী মীরের নিয়োগ নিয়ে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন উঠেছে তাঁর একটি সনদের সময়কাল নিয়ে। অভিযোগ অনুযায়ী, তাঁর নিয়োগ ২০১২ সালে হলেও সংশ্লিষ্ট একটি লাইব্রেরি-সংক্রান্ত সনদ অর্জন করা হয় ২০১৮ সালে।
প্রশ্ন হচ্ছে—২০১২ সালে নিয়োগের সময় তিনি কোন যোগ্যতা ও সনদের ভিত্তিতে নিয়োগ পেয়েছিলেন?
তবে পরবর্তী সময়ে কোনো সনদ অর্জন করা হয়েছে—এ তথ্য একাই আগের নিয়োগকে অবৈধ বা সনদকে জাল প্রমাণ করে না। প্রকৃত সত্য জানতে ২০১২ সালের নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি, আবেদনপত্র, শিক্ষাগত সনদ, নিয়োগ কমিটির কার্যবিবরণী, নিয়োগপত্র, যোগদানপত্র এবং সনদ যাচাইয়ের নথি পরীক্ষা করা জরুরি।
আফরোজার নিয়োগও যাচাইয়ের দাবি
শিক্ষিকা আফরোজা খাতুনের নিয়োগের সময় প্রয়োজনীয় শিক্ষাগত যোগ্যতা ছিল কি না—এ নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। তাঁর নিয়োগের ভিত্তি, জমা দেওয়া সনদ এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের যাচাই প্রতিবেদন প্রকাশ্যে এলে বিষয়টি পরিষ্কার হবে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন ।
সনদ জালিয়াতির অভিযোগ সত্য কি না, তা নির্ধারণের জন্য সংশ্লিষ্ট শিক্ষা বোর্ড/বিশ্ববিদ্যালয় বা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে সনদ যাচাই করাই হবে সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য পদ্ধতি।
শ্যামলীর প্রায় নয় মাস বিদেশ অবস্থান
শিক্ষিকা শ্যামলী রানী চন্দ্রের প্রায় নয় মাস কানাডায় অবস্থানের বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে। প্রশ্ন উঠেছে—এই সময় তিনি অনুমোদিত ছুটিতে ছিলেন কি না এবং বিদ্যালয়ের নথিতে তাঁর উপস্থিতি কীভাবে দেখানো হয়েছে।
এ ক্ষেত্রে তাঁর ছুটির আবেদন ও অনুমোদন, পাসপোর্টের ইমিগ্রেশন রেকর্ড, হাজিরা রেজিস্টার এবং সংশ্লিষ্ট সময়ের বেতন-ভাতা প্রদানের নথি যাচাই করলেই বিষয়টি পরিষ্কার হবে।
বিদেশে অবস্থান নিজে কোনো অনিয়মের প্রমাণ নয়; অনিয়ম হয়েছে কি না, তা নির্ধারণ করবে সংশ্লিষ্ট সরকারি ও বিদ্যালয় নথি।
কোচিং বন্ধের উদ্যোগের পরই কি বিরোধ?
বিদ্যালয়ের অভ্যন্তরীণ বিরোধের পেছনে কোচিং কার্যক্রম নিয়ে মতবিরোধের অভিযোগও রয়েছে। সংশ্লিষ্টদের দাবি, প্রধান শিক্ষিকা বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের কোচিং কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ বা বন্ধের উদ্যোগ নেওয়ার পর থেকেই বিরোধ তীব্র হয়।
শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে টাকা ও কোচিং সুবিধার অভিযোগ
বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন নিয়েও গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। একটি পক্ষের দাবি, কিছু শিক্ষার্থীকে ৫০০ টাকা এবং এক মাসের কোচিং বিনামূল্যে দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে আন্দোলনে সম্পৃক্ত করা হয়েছিল।
অভিযোগটি সত্য হলে এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। তবে এটি নিশ্চিত করতে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের বক্তব্যের পাশাপাশি ভিডিও, মেসেজ, অর্থ লেনদেনের প্রমাণ এবং প্রত্যক্ষদর্শীদের সাক্ষ্য যাচাই করা প্রয়োজন। শিক্ষার্থীরা অপ্রাপ্তবয়স্ক হলে তাঁদের পরিচয় ও ব্যক্তিগত তথ্য গোপন রাখা জরুরি।
২০২৪ সালের পরীক্ষার দায়িত্ব নিয়েও অভিযোগ
২০২৪ সালের পরীক্ষায় দায়িত্বপ্রাপ্ত কয়েকজন শিক্ষক পরীক্ষার হলে না থেকে অফিসকক্ষে অবস্থান করেছিলেন—এমন অভিযোগও রয়েছে।
অভিযোগ শুধু রাশেদার বিরুদ্ধেই নয়
অনুসন্ধানে জানা গেছে, বিদ্যালয়ের কয়েকজন শিক্ষক-শিক্ষিকার বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগ তুলে অভিভাবকদের পক্ষ থেকে জেলা প্রশাসকের কাছে অভিযোগ দেওয়া হয়েছে। কিন্তু এখন পর্যন্ত তদন্ত হয়নি বলে জানা গেছে।
অভিভাবকদের বক্তব্য, একজনকে নিয়ে তদন্ত হলে অন্যদের বিরুদ্ধেও ওঠা অভিযোগ একই মানদণ্ডে তদন্ত করা উচিত।
তৈয়ব আলী মীরের বক্তব্য জানতে যোগাযোগ করা হলে তিনি ব্যস্ত আছেন বলে জানান এবং ফোন কেটে দেন। আফরোজা খাতুন ফোন রিসিভ করেননি। শ্যামলী রানী চন্দ্র দেশের বাইরে থাকায় তাঁর বক্তব্য নেয়া যায়নি ।
অন্যদিকে শিক্ষক সারওয়ার হোসেন বাদল অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, রাশেদা বেগমের সঙ্গে তাঁর কোনো ব্যক্তিগত শত্রুতা নেই। তাঁর দাবি, বিদ্যালয়ের প্রভিডেন্ট বা টিফিন ফান্ডে অনিয়ম হয়ে থাকলে তা শুধু প্রধান শিক্ষিকার একক সিদ্ধান্তে হওয়ার কথা নয়। ২০ আগস্টের ঘটনাতেও তিনি নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করেন।
তদন্তেই বেরিয়ে আসতে পারে প্রকৃত সত্য
হাফিজা খাতুন বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ের ঘটনাপ্রবাহে এখন সবচেয়ে জরুরি প্রশ্ন—অভিযোগগুলো কতটা সত্য এবং কার দায় কতটুকু?
মন্ত্রণালয়ের তদন্তে রাশেদা বেগমের বিরুদ্ধে অর্থ আত্মসাতের প্রমাণ না পাওয়ার বিষয়টি যেমন স্পষ্টভাবে বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন, তেমনি তৈয়ব আলী ও আফরোজার নিয়োগ ও সনদ, শ্যামলীর বিদেশ অবস্থান, কোচিং কার্যক্রম এবং শিক্ষার্থীদের আন্দোলন ঘিরে ওঠা অভিযোগগুলোরও নথিনির্ভর তদন্ত প্রয়োজন।
বিদ্যালয়ে অভিযুক্তদের নিয়োগ থেকে শুরু করে বর্তমান সময় পর্যন্ত বিদ্যালয়ের নিয়োগ, সনদ যাচাই, ছুটি, হাজিরা, বেতন-ভাতা, কোচিং কার্যক্রম ও সংশ্লিষ্ট অভিযোগগুলোর পূর্ণাঙ্গ নিরপেক্ষ তদন্তের জোর দাবি উঠেছে।
